হামের লক্ষণ নিয়ে শিশুর মৃত্যু একশ ছাড়াল : উচ্চঝুঁকিতে পাঁচ জেলা

ষ্টাফ রিপোর্টার

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ১৫ মার্চ থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে পাঁচ হাজার ৭৯২ শিশু, যার মধ্যে ১০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের ৯ জনের শরীরে ল্যাবরেটরিতে হাম শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের হালনাগাদ তথ্যে এসব তথ্য জানা যায়। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯৪৭ শিশু, শনাক্ত হয়েছে ৪২ জন, এবং মারা গেছে আরও তিন শিশু।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫৬ জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে। কক্সবাজার, বরগুনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও নাটোরকে উচ্চঝুঁকির এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশনও হটস্পট হিসেবে বিবেচিত। আক্রান্তের তুলনায় কক্সবাজারেই রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ আক্রান্তের সংখ্যা ৩১৫। উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে দুই হাজার ৩৯৪ শিশু, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে এক হাজার ১৯২ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে আক্রান্ত ১৯৯ জন, ভর্তি ৭১৭; বরিশালে আক্রান্ত ৭৬, ভর্তি ৩৫৯ জন। খুলনায় আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও ভর্তি হয়েছে ৮৯ শিশু। ময়মনসিংহে আক্রান্ত ৪৪ জন, ভর্তি ১৮৬ এবং ছাড়পত্র পেয়েছে ৪৯ শিশু।

এর আগে প্রকাশিত তথ্য সংশোধন করে পাঁচটি মৃত্যুকে জাতীয় হিসাব থেকে বাদ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর থেকে পাঠানো ভুল তথ্য সংশোধন করা হয়েছে। নতুন করে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি মৃত্যু তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

হামের বিস্তার ঠেকাতে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালু করতে যাচ্ছে সরকার। ইপিআই-এর উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানিয়েছেন, দুই সপ্তাহব্যাপী এই কর্মসূচি শুরুতে ২০–২১টি উপজেলাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হবে। এদিকে পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের সব সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পাঁচটি ওয়ার্ডে ১০টি স্থায়ী কেন্দ্রে আগামীকাল থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হবে।

আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন, আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। টিকা কার্যক্রমে জনবল সংকট কাটিয়ে দক্ষতা অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টন করতে হবে। পাশাপাশি কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।

গোপালগঞ্জে হামের উপসর্গ নিয়ে ১০ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং সব হাসপাতালে আইসিইউ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক। চলতি বছর সেখানে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ২৯ শিশু। মাত্র আড়াই মাসে ৫৩ শিশু মারা গেছে, যার বড় অংশের শরীরে হাম ধরা পড়ে। শয্যা সংকটের কারণে এক বেডে একাধিক শিশুকে রাখার পাশাপাশি বারান্দায়ও রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

বরিশাল বিভাগে গত এক সপ্তাহে হামে আক্রান্ত হয়ে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মানিকগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১০ শিশু। চট্টগ্রামের হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের ৭০ শতাংশই টিকা নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হয়েছে, যাদের বয়স ৪ থেকে ৯ মাস। চিকিৎসকরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই সংক্রমণ দেখা দেওয়া উদ্বেগজনক এবং বিষয়টি গবেষণার দাবি রাখে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন ৬৮ শিশু। ইতোমধ্যে মারা গেছে পাঁচজন। জেলা পর্যায়ে ১৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশেষ নজরদারি কমিটি করে মনিটরিং বাড়ানো হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *