হরমুজ প্রণালি বন্ধ, যে সংকটে পড়বে বাংলাদেশ

ষ্টাফ রিপোর্টার

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বিস্তার ঘটার পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং এর জবাবে ইরানের পাল্টা আঘাত পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে, আর সেই ধাক্কা এসে লেগেছে বাংলাদেশের জ্বালানি, কৃষি ও বাণিজ্য খাতে। বিশ্লেষকদের মতে, সংকট দীর্ঘায়িত হলে খাদ্য উৎপাদন, রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স এবং মূল্যস্ফীতির ওপর একযোগে চাপ বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, আপাতত তেলের দাম বাড়ার শঙ্কা নেই। বিকল্প বাজার বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশে ১ লাখ ৩৬ হাজার টন জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে এবং মঙ্গলবার পর্যন্ত সাতটি জাহাজের এলসি সম্পন্ন হয়েছে।

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বাংলাদেশে আসা তেলের বড় অংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে পরিবাহিত হয়। সৌদির রাস তানুরা টার্মিনালে ড্রোন হামলার পর লোডিং স্থগিত হওয়ায় সরবরাহ শৃঙ্খলা অনিশ্চয়তায় পড়েছে। জ্বালানি বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইস্টার্ন রিফাইনারির কাঁচামাল সরবরাহের সময়সূচি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত প্রায় দুই সপ্তাহের চাহিদা মেটানোর মতো। সামনে বোরো মৌসুমে সেচের চাপ বাড়বে, ফলে ডিজেল সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কৃষি উৎপাদনে বড় ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিপিসি জানায়, মার্চ থেকে জুন সময়কালের জন্য অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার ফলে আমদানি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে ডিজেলের মজুত ২ লাখ ১৪ হাজার ৬২ টন, যা প্রায় ১৪ দিনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। অকটেন, পেট্রোল, জেট ফুয়েল, ফার্নেস অয়েল ও কেরোসিনের মজুতও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যথেষ্ট রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজেল ও সারের ওপর একসঙ্গে চাপ সৃষ্টি হলে বোরো উৎপাদন ব্যাহত হবে, এতে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং বাজারে চালের দাম বাড়তে পারে।

২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় তিন শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার ছাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর বিভিন্ন গ্রেডের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

জাহাজ চলাচলেও জটিলতা দেখা দিয়েছে। হরমুজ ও লোহিত সাগর অনিরাপদ হওয়ায় আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে চলতে বাধ্য হচ্ছে, এতে যাত্রা সময় ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত বাড়ছে। পাশাপাশি ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ আরোপ হওয়ায় প্রতিটি কন্টেইনারের খরচ কয়েক হাজার ডলার বেড়ে যাচ্ছে।

রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, বাড়তি ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিদেশি ক্রেতাদের ওপর এই বাড়তি খরচ চাপানো কঠিন হয়ে পড়ায় মুনাফা কমছে এবং নতুন অর্ডার পাওয়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত ৬০ থেকে ৭০ লাখ বাংলাদেশির চাকরি ও আয়ও ঝুঁকিতে পড়তে পারে, কারণ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বহু নির্মাণ প্রকল্প স্থগিত হতে পারে। এতে রেমিট্যান্স কমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়বে।

এদিকে বিশ্বের বড় অংশের ইউরিয়া সার হরমুজ রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়। দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও বাড়বে। একই সময়ে ডিজেলের সংকট দেখা দিলে কৃষি উৎপাদন দ্বিমুখী চাপে পড়বে।

সরকার জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় মজুত নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বল্পমেয়াদি মজুত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। বিকল্প জ্বালানি উৎস, সরবরাহ বৈচিত্র্য এবং কৌশলগত মজুত বাড়ানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ এখন অত্যন্ত জরুরি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *