রাজধানীর ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) বড় ধরনের সংশোধনের পথে। সরকারের নতুন প্রস্তাবে ঢাকার বহু এলাকায় ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে, যা ভবন নির্মাণের উচ্চতা ও আয়তনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে।
রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, সংশোধিত ড্যাপে পুরো শহরকে ৬৫টি জনঘনত্ব ব্লকে ভাগ করে প্রতিটি ব্লকের জন্য নতুন এফএআর নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ছোট প্লটেও বেশি তলার ভবন নির্মাণ সম্ভব হবে, যা আবাসন বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
খুব শীঘ্রই চূড়ান্ত অনুমোদন
খুব শীঘ্রই ‘ড্যাপ সংশোধন’ এবং ‘ঢাকা ইমারত বিধিমালা ২০২৫’ চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে। এর আগে রিহ্যাব, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউশন অব প্ল্যানার্স, রাজউক ও উপদেষ্টা পরিষদের মতামত নিয়ে খসড়া প্রস্তাব প্রস্তুত হয়েছে। অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি হবে।
এফএআর—কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এফএআর হলো একটি প্লটে মোট কতটুকু ফ্লোর স্পেস নির্মাণ করা যাবে তার অনুপাত। যেমন: ১,০০০ বর্গফুট জমির এফএআর ১.৫ হলে মোট ফ্লোর স্পেস হবে ১,৫০০ বর্গফুট। নগর পরিকল্পনায় এফএআর ভবনের ঘনত্ব, উচ্চতা, আলো-বাতাস প্রবাহ ও অবকাঠামোগত চাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সংশোধিত ড্যাপে যেসব পরিবর্তন আসছে
- আবাসিক ইউনিটের সর্বোচ্চ এফএআর ২.৩, প্রযোজ্য এলাকা—রামপুরা, বাড্ডা, তেজগাঁও, তারাবো, হেমায়েতপুর, সাভার ও টঙ্গী।
- গুলশান ও বনানীর এলাকাভিত্তিক সর্বোচ্চ এফএআর ৫.৫ (আগে ছিল ৫.৭), তবে আবাসন এফএআর বেড়ে ২.০ হয়েছে।
- মিরপুরে আবাসন এফএআর ১.৭ থেকে ২.০, এলাকাভিত্তিক ২.৮ থেকে ৩.৪।
- খিলক্ষেত এলাকায় বিশাল পরিবর্তন—এলাকাভিত্তিক ১.৪ থেকে ৪.২, আবাসন ১.২ থেকে ২.০।
- বসুন্ধরা, বারিধারা, উত্তরা, আফতাবনগরসহ একাধিক এলাকায় আংশিক বৃদ্ধি।
- বিমানবন্দর এলাকার এফএআর এখনো নির্ধারিত হয়নি।
এছাড়া ‘সেটব্যাক এলাকা’ ২৫-৪০% রাখা এবং ভবনের মাঝে আলো-বাতাস নিশ্চিত করতে ৭২ ডিগ্রি কৌণিক দূরত্ব রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
‘ঢাকা ইমারত বিধিমালা ২০২৫’-এর নতুন শর্ত
- ৭০% বা ৪২.৪৩ কাঠা থেকে দেড় একরের কম জমিতে অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণে নগর পরিকল্পনাবিদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক।
- দেড় একরের বেশি জমিতে প্রকল্প হাতে নিতে হলে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের ছাড়পত্র লাগবে।
- নদীতীর ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় প্রকল্পের আগে বন্যা প্রবাহ ও পানি নিষ্কাশনের প্রভাব যাচাই জরুরি।
- রাস্তা প্রশস্তকরণের জন্য জমি অধিগ্রহণ হলে মালিককে তিনগুণ ক্ষতিপূরণ।
- ঢালু ছাদে সর্বোচ্চ বিন্দুই ভবনের উচ্চতা হিসেবে ধরা হবে।
ডেভেলপার বনাম নগর পরিকল্পনাবিদ—বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু
ডেভেলপারদের দাবি:
ঢাকার জনসংখ্যা ও জমির সীমাবদ্ধতার কারণে উঁচু ভবন অপরিহার্য। রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল লতিফের মতে, রাজধানীর ন্যূনতম এফএআর ৩.৫–৪.০ হওয়া উচিত, যাতে ৪০% সেটব্যাক রেখে ৮তলা ভবন সম্ভব হয়।
নগর পরিকল্পনাবিদদের সতর্কবার্তা:
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউশন অব প্ল্যানার্সের প্রেসিডেন্ট আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, অতিরিক্ত উচ্চতার ভবন আলো-বাতাস প্রবাহ কমাবে, পরিবেশের ক্ষতি করবে এবং শহরের আকাশরেখা ঘন করে তুলবে।
বর্তমান ড্যাপ ২০২২–২০৩৫ কার্যকর হয় ২৪ আগস্ট ২০২২-এ। কিন্তু আবাসন ব্যবসায়ী ও জমির মালিকরা তখন থেকেই সংশোধনের দাবি জানাচ্ছিলেন। সরকারের পরিবর্তনের পরেও এই চাপ অব্যাহত ছিল। ২০ মে ঢাকা সিটি ল্যান্ড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন রাজউক ঘেরাও করে হুমকি দেয়—সংশোধন না হলে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে।
এফএআর বৃদ্ধির ফলে ঢাকার আকাশরেখা বদলে যাবে—এটা নিশ্চিত। তবে এই পরিবর্তন কতটা ইতিবাচক হবে তা নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষার ওপর। প্রশ্ন এখন—এই পরিবর্তন কি ঢাকাকে আরও বাসযোগ্য করবে, নাকি জনঘনত্ব ও বিশৃঙ্খলায় ভরা এক অচল নগরীতে পরিণত করবে?