ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর মাত্র এক দিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ভোটের আগে সারা দেশে চলছে তীব্র বিশ্লেষণ, হিসাব-নিকাশ আর ভোটারদের মনোভাব বোঝার চেষ্টা। মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নিজেদের পক্ষে ভোট টানতে নানা কৌশলে কাজ করছে। এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক, যারা এবার ভোটের মাঠে থাকলেও দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে, শীর্ষ নেতারা দেশত্যাগ করেছেন, অনেকে কারাবন্দি। ফলে মাঠে থাকা আওয়ামী সমর্থকদের বড় অংশ নিজেদের নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কেন্দ্রীয় বর্জন অবস্থান উপেক্ষা করে তৃণমূলের বহু নেতা-কর্মী ইতোমধ্যে ভোটের মাঠে সক্রিয়। কোথাও বিএনপি, কোথাও জামায়াত বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে তাদের দেখা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী ভোটারদের একটি বড় অংশ এবার বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন। যদিও জামায়াতও ভোটের জন্য তাদের কাছে টানার চেষ্টা করছে, তবু সামগ্রিকভাবে বিএনপিই বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একাধিক জনমত জরিপেও দেখা গেছে, আওয়ামী সমর্থকদের বড় অংশ বিএনপিকে ভোট দিতে পারেন। বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যায়, এবারের নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। বিএনপি ইস্যুটি সামনে এনে কৌশলগত সুবিধা নিতে চায়। মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা দীর্ঘদিনের বিতর্কের বিষয়; বিপরীতে বিএনপি নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দাবি করে। অন্যদিকে আওয়ামী সমর্থকদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ একটি আবেগের জায়গা, যা তাদের ভোট সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলছে।
বিশ্লেষকরা আরও মনে করেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা পরে এনসিপি গঠন করেন, যা আওয়ামী সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে সোচ্চার ছিল জামায়াত, এনসিপি ও কয়েকটি দল। সরকার যখন আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে, তখন বিএনপি এ বিষয়ে নীরব ভূমিকা নেয়। টাইম ম্যাগাজিনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারেক রহমানও বলেছেন, তিনি কোনো দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন। এসব কারণে অনেক আওয়ামী ভোটার বিএনপির প্রতি তুলনামূলক বেশি স্বস্তি অনুভব করছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বৈরী; যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া এই দূরত্ব আরও বাড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা দেখলেই বোঝা যায়, মাঠে আওয়ামী নেতাকর্মীরা সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে দলটির সাবেক সহপ্রচার সম্পাদক সুনন্দন দাস রতনের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যেখানে তাকে বিএনপির প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীনের পক্ষে ভোট চাইতে দেখা যায়। ঢাকা-১৯ আসনে বিএনপি প্রার্থী ডা. দেওয়ান সালাউদ্দিন বাবুর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে দেখা গেছে সাবেক প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমানের পরিবারকে। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালানোয় কয়েকজন আওয়ামী নেতাকর্মীকে মারধরের ঘটনাও ঘটেছে। সাতক্ষীরায় একাধিক আসনে আওয়ামী কর্মীদের জামায়াতের প্রচারণায় দেখা গেছে। ঝিনাইদহে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে আওয়ামী নেতাকর্মীরা খোলাখুলিভাবে মাঠে রয়েছেন। এসব উদাহরণ দেখায়, নিষিদ্ধ দল হওয়ায় সরাসরি অংশ না নিলেও আওয়ামী সমর্থকরা বিভিন্ন আসনে নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, আদর্শগতভাবে বিএনপি ও জামায়াত কোনওটিই আওয়ামী লীগের সঙ্গে যায় না। কিন্তু ভোট দিতে গেলে আওয়ামী ভোটারদের সামনে দুটো পথ—ইসলামপন্থি দল বা অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থি দল। এ অবস্থায় তারা বিএনপিকেই বেশি পছন্দ করতে পারেন। তার মতে, আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের আদর্শিক লড়াই জামায়াতের সঙ্গে, তাই টিকে থাকতে গেলে তাদের সমর্থকরাই মধ্যপন্থি হিসেবে বিএনপিকে বেছে নিতে উৎসাহী হবেন।
১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নির্বাচনের গ্রহণযোগ্য ফলাফলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের জনসমর্থন ছিল ক্রমবর্ধমান। তবে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে দলটির প্রতি ভোটারদের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর অনিয়ম-জবরদখলও জনসমর্থন কমিয়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দলের প্রকৃত ভোটশক্তি কতটা কমেছে, তা নির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে দলটির পক্ষ থেকে সামাজিক মাধ্যমে ‘যে নির্বাচনে নৌকা নেই, সে নির্বাচনে ভোট নয়’ প্রচার চালানো হচ্ছে। তবুও স্থানীয় বাস্তবতা ও রাজনৈতিক হিসাবের কারণে তাদের বহু সমর্থক ভোটকেন্দ্রে যাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু এ বিষয়ে বলেন, ভোটার যার পছন্দ, তাকে ভোট দেবেন। আগেভাগে বিভিন্ন জরিপ বা অনুমানের ভিত্তিতে ফল ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রকৃত ফল জানা যাবে ভোটের দিনই।
ইএএসডি’র জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, আওয়ামী সমর্থকদের মধ্যে যারা ভোট দেবেন, তাদের ৮০ শতাংশই বিএনপিকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন। জামায়াত পেতে পারে ১৫ শতাংশ ভোট। সামগ্রিক হিসেবে বিএনপির পক্ষে ভোটারদের সমর্থন দাঁড়িয়েছে ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশে। নারী ভোটারদের মধ্যে এই সমর্থন আরও বেশি। জরিপ বলছে, বিএনপি জোট ২০৮টি আসনে জয় পেতে পারে এবং ৬৮ শতাংশ উত্তরদাতা তারেক রহমানকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চান।
অন্যদিকে সিআরএফ ও ইপোসের যৌথ জরিপে দেখা গেছে, আগে আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন, এমন ভোটারদের প্রায় ৪৮ শতাংশ এখন বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন। জামায়াতের দিকে ঝুঁকছেন প্রায় ৩০ শতাংশ এবং এনসিপিকে ভোট দিতে চান ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার। বাকি ভোটাররা অন্য দলকে ভোট দেবেন বা এখনো সিদ্ধান্ত নেননি।
সমগ্র চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, নিষিদ্ধ দল হয়েও আওয়ামী লীগের সমর্থক-ভোটাররা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছেন।









