নোটিশের জবাবে যা লিখলেন ‘অভিমানী’ হাসানাত ও পাটোয়ারি

ষ্টাফ রিপোর্টার

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে যোগ না দিয়ে দলবলে কক্সবাজার ভ্রমণে গেছেন এনসিপির ৫ নেতা। তালিকায় ছিলেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ ও যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ (তাসনিম জারার স্বামী)।

এ নিয়ে জল ঘোলা কম হয়নি। গুজব উঠেছিল সাবেক এক মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করতে সেখানে গেছেন তারা তবে সময়ের সঙ্গে প্রকাশ্যে আসতে থাকে নতুন নতুন তথ্য। শেষপর্যন্ত নেতাদের কক্সবাজার সফরে যাওয়ার ব্যাখ্যা চেয়ে নোটিশ দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

২৪ ঘন্টার মধ্যে নোটিশের লিখিত জবাব দিয়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের মূখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। দুজনের জবাবের মধ্যেই অন্তবর্তীকালীন সরকার ও তাদের দল এনসিপির প্রতি অভিমানের সুর। আজ বৃহস্পতিবার (৭ আগষ্ট) নোটিশের জবাব ফেসবুকেও প্রকাশ করেছেন এ দুই নেতা।ফেসবুকে হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেছেন, ‘৪ আগস্ট সন্ধ্যায় জানতে পারি, আন্দোলনের আহত ও নেতৃত্বদানকারী অনেক ভাইবোনকে অনুষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এটা আমার কাছে শুধু রাজনৈতিক নয়, নৈতিক ব্যর্থতা বলেই মনে হয়েছে। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে এই অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।’

হাসনাত আবদুল্লাহ আরো লিখেছেন, ‘যেখানে ঐক্যের পরিবর্তে বিভাজনকে, শহীদ ও আহতদের পরিবর্তে কিছু মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীর কথা এবং মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, সেখানে উপস্থিত থাকার কোনো ইচ্ছা বা প্রয়োজন আমি বোধ করিনি। কাজেই ঢাকার বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। উদ্দেশ্য ছিল এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টিতে পূর্বে গৃহীত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বোঝার চেষ্টা করা এবং পরবর্তী করণীয় নিয়ে চিন্তা করা। একইসঙ্গে এটি ছিল একটা অসম্পূর্ণ জুলাই ঘোষণাপত্রের প্রতি আমার নীরব প্রতিবাদ।’

৪ আগস্ট রাতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মাধ্যমে নাহিদ ইসলামকে এই ভ্রমণের বিষয়ে অবগত করা হয় বলেও লিখেছেন হাসনাত। তাদের ভ্রমণ নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থা ও গণমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর প্রসঙ্গ টেনে এর সমালোচনা করেন তিনি। লিখেছেন, ‘আমাদের পার্টির উচিত ছিল এই গোয়েন্দা সংস্থা ও অসৎ মিডিয়ার বিরুদ্ধে দৃঢ় ব্যবস্থা নেওয়া। তার পরিবর্তে পার্টি এমন ভাষায় আমাদের বিরুদ্ধে শোকজ প্রকাশ করেছে, যা মিথ্যা অভিযোগ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে উসকে দিয়েছে।’

কারণ দর্শানোর নোটিশে দলের গঠনতন্ত্রের কোনো ধারা লঙ্ঘনের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি বলেও উল্লেখ করেছেন এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মূখ্য সংগঠক।

অন্যদিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘সাগরের পাড়ে বসে আমি গভীরভাবে ভাবতে চেয়েছি গণ-অভ্যুত্থান, নাগরিক কমিটি, নাগরিক পার্টির কাঠামো, ভবিষ্যৎ গণপরিষদ এবং একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধানের রূপরেখা নিয়ে। আমি এটিকে কোনো অপরাধ মনে করি না, বরং একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্য এটি একটি দায়িত্বশীল মানসিক চর্চা।’

ফেসবুক পোস্টটিকে শোকজ নোটিশের জবাব হিসেবে উল্লেখ করে নাসীরুদ্দীন লিখেছেন, ‘৫ আগস্ট আমার কোনো পূর্বনির্ধারিত রাষ্ট্রীয় বা সাংগঠনিক কর্মসূচি ছিল না। দল থেকেও আমাকে এ সংক্রান্ত কোনো দায়িত্ব বা কর্মপরিকল্পনা জানানো হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘৪ আগস্ট রাতে দলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ তার কোচিং অফিসের সহকর্মীর ফোন ব্যবহার করে আমাকে জানায় যে, তিনি তার স্কুল বন্ধুদের সঙ্গে দুইদিনের জন্য ঘুরতে যাবেন। আমি তাকে আহ্বায়ক মহোদয়কে অবহিত করতে বলি এবং তিনি জানান যে বিষয়টি জানাবেন, এবং আমাকেও জানাতে বলেন যেহেতু তার নিজস্ব ফোন পদযাত্রায় চুরি হয়ে গিয়েছিল।’

নাসীরুদ্দীন বলেন, ‘৪ আগস্ট রাতে পার্টি অফিসে আমি আহ্বায়ক মহোদয়ের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি জানাই। একই রাতে আমি সদস্য সচিব মহোদয়ের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করি এবং জানতে পারি যে, রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রামে দল থেকে তিনজন প্রতিনিধি যাচ্ছেন এবং সেখানে আমার কোনো কাজ নেই।’

‘আমি কোনো দায়িত্বে না থাকায়, এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও মানসিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঘুরতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। সফরসঙ্গী হিসেবে সস্ত্রীক সারজিস আলম ও তাসনিম জারা-খালেদ সাইফুল্লাহ দম্পতি যুক্ত হন,’ বলেন তিনি।

ফেসবুক পোস্টে নাসীরুদ্দীন আরও বলেন, ‘আমি ঘুরতে গিয়েছিলাম, তবে এই ঘোরার লক্ষ্য ছিল রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে একান্তে চিন্তা-ভাবনা করা। সাগরের পাড়ে বসে আমি গভীরভাবে ভাবতে চেয়েছি গণঅভ্যুত্থান, নাগরিক কমিটি, নাগরিক পার্টির কাঠামো, ভবিষ্যৎ গণপরিষদ এবং একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধানের রূপরেখা নিয়ে। আমি এটিকে কোনো অপরাধ মনে করি না, বরং একজন রাজনৈতিক কর্মীর জন্য এটি একটি দায়িত্বশীল মানসিক চর্চা।’

‘কক্সবাজার পৌঁছানোর পর হঠাৎ গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে আমরা নাকি সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। আমি তাৎক্ষণিকভাবে গণমাধ্যমকে জানাই যে, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার। হোটেল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে জানায় সেখানে পিটার হাস নামে কেউ নেই। পরবর্তীতে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, তিনি তখন ওয়াশিংটনে অবস্থান করছিলেন,’ যোগ করেন তিনি।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘এই গুজব একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র এবং আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপচেষ্টা। অতীতেও আমি এই হোটেলে থেকেছি এবং কখনো কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হয়নি। অতীতেও আমি বেশ কয়েকবার ঘুরতে গিয়েছি, কিন্তু ঘুরতে আসলে দলের বিধিমালা লঙ্ঘন হয়, এমন কোনো বার্তা আমাকে কখনো দল থেকে দেয়া হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতির আলোকে আমি মনে করি শোকজ নোটিশটি বাস্তবভিত্তিক নয়। আমার সফর ছিল স্বচ্ছ, সাংগঠনিক নীতিমালাবিরোধী নয় এবং একান্ত ব্যক্তিগত চিন্তা-ভাবনার সুযোগ মাত্র। তবুও দলীয় শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এবং রাজনৈতিক শালীনতা বজায় রেখে আমি এই লিখিত জবাব প্রদান করছি। অসভ্য জগতে সভ্যতার এক নিদের্শন হিসেবে।’

‘আমার বক্তব্য স্পষ্ট: ঘুরতে যাওয়া অপরাধ নয়। কারণ ইতিহাস কেবল মিটিংয়ে নয়, অনেক সময় নির্জন চিন্তার ঘরে বা সাগরের পাড়েও জন্ম নেয়,’ বলেন এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *