স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ বিষয়ে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও পঞ্চম এলডিসি সম্মেলনের মহাসচিব রাবাব ফাতিমার।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে এখনই এই সফর না করার অনুরোধ জানানো হয়। ফলে সফরের নতুন তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, আগামী মাসে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর হতে পারে।
গত নভেম্বরে এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ, অর্থনৈতিক প্রস্তুতি মূল্যায়ন ও নির্বিঘ্ন উত্তরণ-সংক্রান্ত রোডম্যাপ তৈরির জন্য জাতিসংঘ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার কাছ থেকে তথ্য ও নথিপত্র সংগ্রহ করে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুতির চূড়ান্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সফর স্থগিত হলেও নির্ধারিত সময়েই প্রতিবেদনটি বাংলাদেশে পাঠানো হবে।
বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান গত বৃহস্পতিবার বলেন, “জাতিসংঘ এখন আসছে না মানে—পরে আসবে। তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন আমরা পেয়ে যাব। এরপর অন্যান্য প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে এগোবে।”
এদিকে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি পর্যাপ্ত নয় দাবি করে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে উত্তরণ পেছানোর আহ্বান জানিয়ে আসছেন। তাদের আশঙ্কা, এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) অধীনে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। এতে রপ্তানি আয় ৬ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এলডিসিদের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ইতিবাচক অবস্থান দেখায়নি। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৭ সদস্য দেশের যে কোনো একটি দেশ আপত্তি তুললে সেটি সম্মিলিত বিরোধিতা হিসেবে গণ্য হয়। ফলে বাংলাদেশকে চ্যালেঞ্জ মেনেই প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, আইসিসি বাংলাদেশসহ মোট ১৬টি সংগঠন গত ২৪ আগস্ট যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছানোর দাবি জানায়। সরকারও জাতিসংঘের কাছে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ তুলে ধরেছে। তবে এখন পর্যন্ত উত্তরণ পেছানোর বিষয়ে কোনো ইতিবাচক সাড়া পায়নি অন্তর্বর্তী সরকার। অন্যদিকে লাওস ও নেপাল—দুটি দেশই উত্তরণ পেছানোর উদ্যোগ নেয়নি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অনুমোদন অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাবে। এর আগে ২০১৮ সালে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকেই উত্তীর্ণ হয়ে দেশটি উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে। পরবর্তী মূল্যায়নের পর সিডিপি ২০২৬ সালে উত্তরণের সুপারিশ দেয়।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক বলেন, “প্রস্তুতির ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে অন্তত তিন বছর উত্তরণ পেছানো প্রয়োজন। ব্যবসায়ীদের যেমন কারিগরি দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার সীমাবদ্ধতা আছে, তেমনি সরকারেরও ঘাটতি বড়।”
তিনি আরও বলেন, “যে স্তরে বাংলাদেশ যেতে চায়, সেখানে অন্যান্য দেশের ব্যাংকঋণের সুদ ৫ শতাংশের নিচে, অথচ আমাদের দেশে তা প্রায় ১৫ শতাংশ। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিশ্চয়তা নেই, সুশাসন ও অবকাঠামোর ঘাটতিও রয়েছে। এসব সমস্যা রেখে শুধু নামমাত্র উত্তরণের লাভ কী?”









